১২ আওলিয়ার বারবাজার

41

বাংলা ডেস্ক: ঝিনাইদহ শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১২ আওলিয়ার বারবাজার। প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনসমৃদ্ধ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ঐতিহাসিক স্থানটি জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায়। এ স্থানকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে নানা কৌতুহল। লুপ্ত গৌরবের বারবাজার কারা প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা সঠিক করে কেউ বলতে পারে না। এর নামকরণ নিয়েও রয়েছে রহস্য। কারো মতে, সিলেট অঞ্চল থেকে ১২ আওলিয়া হযরত বড়খান গাজির সাথে এসে এখানে আস্তানা গাড়েন। সেই থেকে বারবাজার নামের উৎপত্তি। আবার অনেকের মতে, খানজাহান আলী (রা.) এর সাথে ১১ জন দরবেশ বাগেরহাট পৌঁছানোর আগে সুন্দরবন অঞ্চল ও আশেপাশে ইসলাম প্রচার করতেন। তারাই এখানে অবস্থান করতেন বলে এই নামকরণ করা হয়। কারো মতে, ১২টি বাজার নিয়ে গঠিত বলেই এলাকার নাম দেয়া হয়েছিল বারবাজার। প্রাচীন এই জনপদের পরিধি ছিল ১০ বর্গ মাইল। এই ১০ বর্গমাইল এলাকার মধ্যে গড়ে ওঠে খোশালপুর, পিরোজপুর, বাদুরগাছা, সাদেকপুর, এনায়েতপুর, মুরাদগড়, রহমতপুর, মোল্লাডাঙ্গা, বাদোদিহি, দৌলতপুর, সাদগাছি ও বেলাট নামে বারটি বাজার। একারণে জনপদের নাম হয় বারবাজার।

কথিত আছে, ১২ জন পীর আওলিয়ার নামে বারবাজারের নামকরণ হয়। তারা হযরত বড়খান গাজির সঙ্গীও ছিলেন। তাদের গ্রামগুলো হলো এনায়েত খাঁর এনায়েতপুর, আবদাল খাঁর নামে আবদালপুর, দৌলত খাঁর নামে দৌলতপুর, রহমত খাঁর নামে রহমতপুর, শমসের খাঁর নামে শমসেরপুর, মুরাদ খাঁর নামে মুরাদগড়, হৈবত খাঁর নামে হৈবতপুর, নিয়ামত খাঁর নামে নিয়ামতপুর, সৈয়দ খাঁর নামে সৈয়দপুর, বেলায়েত খাঁর নামে বেলাত বা (বেলাটনগর) ও শাহাবাজ খাঁর নামে শাহাবাজপুর।

এসব আওলিয়ার নামে শুধু বারবাজার নয়, পার্শ্ববর্তী অনেক গ্রামমগঞ্জের নামও তাদের নামানুসারে রাখা হয়েছে। তবে ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া যায়, বারবাজারে হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী ছিল। গ্রীক ইতিহাসে পেরিপাসে প্রথম শতকে যে গঙ্গারিডি বা গাঙ্গেয় রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় তা এর নদী বিধৌত এলাকা। এখানে গঙ্গারিডি নামের এক শক্তিশালী জাতি বাস করত। এদের রাজধানী ছিল বারবাজার। এখানকার প্রাচীন নাম গঙ্গারিজিয়া বা গঙ্গারোজিয়া বারবাজারে একদা সমতট রাজ্যের রাজধানী ছিল। সপ্তম শতকে এখানে বৌদ্ধ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসনামলে বিশেষ উন্নতি হয়েছিল। খানজাহান আলীর আগমনের পূর্বেই গঙ্গারিজিয়া রাজ্যের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায় এবং তিনি যখন বারবাজারে অবস্থান করতেন তখন এটা ছিল নাম করা বন্দর। এরপর এখানে পাল বংশ, সেন, মোগল, পাঠান, ইংরেজসহ বহু জাতির আবির্ভাব ঘটে।

তবে কীভাবে এই সমৃদ্ধশালী সৌন্দর্যময় গঙ্গারিজিয়া বা বৈরাটনগর বা বারবাজার ভগ্নস্তুপে পরিণত হয় তা স্পষ্ট নয়। কিংবদন্তি আছে, বঙ্গবিজয়ী বীর ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী নদীয়া দখলের পর নদীয়ার দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দিকে মনোযোগী না হয়ে উত্তরদিকে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। ফলে তার বিজিত রাজ্য উত্তরদিকে প্রশস্ত হতে থাকে। পরিশেষে সামছুদ্দিন ইলিয়াস শাহের পৌত্র নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ-এর শাসনামলে যশোর ও খুলনার তার রাজ্যভুক্ত হয়। ওই অঞ্চলে তিনি বিজয়ের গৌরব অর্জন করেন। বৃহত্তর খুলনা জেলার বাগেরহাটের পরশমণি শ্রেষ্ঠ আওলিয়া হযরত খানজাহান আলী। তিনি ১৬৫৯ সালে (৮৬৩) হিজরী ২৩ অক্টোবর ইহধাম ত্যাগ করেন। তিনি এক সময় নিজের আত্মরক্ষার্থে একটি ক্ষুদ্র সেনাবাহিনীর অধিনায়ক হয়ে কুষ্টিয়া জেলার দৌলতগঞ্জে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বৃহত্তর যশোর জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার হাকিমপুর হয়ে বারবাজার অভিমুখে রওনা দেন। পথিমধ্যে জনসাধারণের পানীয়জলের তীব্র কষ্ট দেখে তিনি এ অঞ্চলে অগণিত দিঘি আর পুকুর খনন করেন। কথিত আছে, একই রাতে এসব জলাশয় খনন করা হয়। ফলে বারবাজার অঞ্চলে ৮৪ একর পুকুর ও দিঘি এখনও বিদ্যমান।

এ অঞ্চলে ১৮টি উল্লেখযোগ্য দিঘির নামানুসারে জানা যায়, পীরপুকুর (৪ একর), গোড়ারপুকুর (৫ একর), সওদাগর দিঘি (১১ একর), সানাইদার পুকুর (৩ একর), সাতপীরের পুকুর (৩ একর), ভাইবোনের দিঘি (৪ একর), আনন্দ (২ একর), গলাকাটা দিঘি (৪ একর), জোড়াবাংলা দিঘি (৩ একর), চোরাগদা দিঘি (৪ একর), মাতারাণী দিঘি (৮ একর), নুনোগোলা দিঘি (৩ একর), কানাইদিঘি (৩ একর), পাঁচ পীরের দিঘি (৩ একর), মনোহর দিঘি (৩ একর), আদিনা দিঘি (৩ একর), শ্রীরাম রাজার দিঘি (১০ একর) ও বেড় দিঘি (৮ একর)। সর্বমোট ৮৪ একর দিঘি।

এক সময় হযরত খানজাহান আলী বেলাট-দৌলতপুরের পূর্ব দিকে বাদুরগাছা গ্রামের প্রভাবশালী শ্রীরাম রাজাধীরাজের মুখোমুখি হয়ে পড়েন এবং কিছুটা বাধাগ্রস্ত হন। ফলে তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারে অধিক উৎসাহী হয়ে এই বারবাজারে এক যুগকাল অবস্থান করেন। তার দৃঢ় মনোবল, উদারতা, দানশীল ও মহানুভবতায় এলাকাবাসী মুগ্ধ হন। অনেক অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণে সচেষ্ট হন।
এভাবে একযুগ অবস্থানের পর তিনি এক শিষ্যের তত্ত্বাবধানে রেখে শেষজীবন বাগেরহাটে পার করেন। খানজাহান আলীর এক যুগ সাধনার স্থাপত্য নিদর্শন রয়ে গেছে এই বারবাজারে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নিদর্শন ৩২ গম্বুজ বিশিষ্ট সাতগাছিয়া আদিনা মসজিদ ও বারবাজার গলাকাটা দিঘির ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ।

ঐতিহ্যবাহী মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো ১৯৯৩ সালে অল্প জায়গার মাটি খুঁড়ে প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন প্রতœতত্ত্বের সন্ধান মিললেও এখানে কোনো পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। মাটি সরিয়ে অভিনব সব স্থাপনা আবিষ্কার করা হলেও তার ইতিহাস ‘মাটিচাপা’ পড়েই থাকছে।

ঝিনাইদহ শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে বারোবাজারের অবস্থান
বারো আউলিয়া, খানজাহান আলী, গাজী কালু চম্পাবতী, গঙ্গারিডিসহ বারোবাজারের ইতিহাসের শেষ নেই। বারোবাজারের রেললাইনের পশ্চিম পাশে তিন বর্গকিলোমিটার জায়গার মধ্যে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মাটি খুঁড়ে মসজিদসহ ১৫টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধ্যান পেয়েছে।
এগুলো হচ্ছে সাতগাছিয়া মসজিদ, ঘোপের ঢিপি কবরস্থান, নামাজগাহ কবরস্থান, গলাকাটা মসজিদ, জোড়বাংলা মসজিদ, মনোহর মসজিদ, জাহাজঘাটা, দমদম প্রতœস্থান, গোড়ার মসজিদ, পীর পুকুর মসজিদ, শুকুর মল্লিক মসজিদ, নুনগোলা মসজিদ, খড়ের দীঘি কবরস্থান, পাঠাগার মসজিদ ও বাদেডিহি কবরস্থান। ১৯৯৩ সাল থেকে খনন করে এ পর্যন্ত ওই নিদর্শনগুলো মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নিদর্শনের এ স্থানটির নাম দিয়েছে ‘শহর মোহাম্মদাবাদ’। মনে করা হয়,এসব পঞ্চদশ শতাব্দীর কীর্তি। তবে ১৯৯৩ সালে জোড়বাংলা মসজিদ খননের সময় একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। তাতে লেখা ছিল শাহ সুলতান মাহমুদ ইবনে পুসাইন ৮০০ হিজরি। এই শিলা লিপিটি এখানকার প্রতœতত্ত্বের অন্যতম দলিল। এ থেকেই বোঝা যায়, নিদর্শনগুলো প্রায় ৭০০ বছরের প্রাচীন। বেশিরভাগ নিদর্শনের পাশে বিরাট বিরাট দীঘি রয়েছে।

গোরার মসজিদ
বারবাজার বেলাট দৌলতপুরে কারুকাজ খচিত বর্গাকৃতির মসজিদটি চার গম্বুজ বিশিষ্ট। মূল ভবনের সঙ্গে চারকোনে আটকোন বিশিষ্ট স্তম্ভ এবং বারান্দার সঙ্গে আরও দুটি স্তম্ভ আছে। মসজিদটির মেহরাব ও দেওয়াল বিভিন্ন নকশা সজ্জিত। মসজিদের অভ্যন্তরে চারি দেওয়ালের সঙ্গে সংযুক্ত আটটি ইটের তৈরী কেবলা দেওয়ালে ও মেহরাবে পোড়া মাটির নকশা, শিকল নকশা,বৃক্ষপত্রাদীর নকশা পুষ্পশোভিত পোড়া মাটির নকশা খঁচিত আছে। মসজিদের পূর্বপাশে একটি বিশাল দীঘি আছে।

জোড়বাংলা মসজিদ
বারবাজার তাহেরপুর রাস্তার বাম পাশে জোড়বাংলা মসজিদটি অবস্থিত। প্রচলিত লোককথা মতে মসজিদের কাছাকাছি জোড়া কুড়ে ঘর ছিল। এ কারণেই হয়তো মসজিদটির নামকরণ জোড়বাংলা হয়ে থাকবে। ধারনা করা হয় এক গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি সুলতান গিয়াস উদ্দীন মাহমুদ শাহের শাসন আমলে নির্মিত। মসজিদের পূর্ব পাশে তিনটি সুচালো খিলান যুক্ত প্রবেশ পথ আছে। মসজিদের চার কোণে আটকোণ বিশিষ্ট চারটি কারুকাজ খঁচিত টাওয়ার আছে।

নুনগোলা মসজিদ
বারবাজার হাসিল বাগে অবস্থিত নুনগোলা মসজিদটিও বর্গাকৃতির একটি মসজিদ। মসজিদটিতে তিনটি অর্ধবৃত্তাকৃতির মেহরাব আছে। মেহরাবে ছোট ছোট বর্গাকৃতির মধ্যে বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা আছে। মসজিদের বাইরের দেওয়ালে পর্যায়ক্রমিক খাড়া চাল ও খাজ আছে। এগুলোতে দিগন্ত রেখাকৃতির ছাচে গড়া নকশা ও বাধন আছে। মসজিদের ওপরে একটি গম্বুজ আছে।

গলাকাটা মসজিদ
বারবাজার তাহেরপুর রাস্তার উত্তর পাশে অবস্থিত গলাকাটা মসজিদটি সুলতানী আমলের আরেক অনিন্দ্য সুন্দর এক স্থাপত্য শিল্প। গোলাকার ঢিবির উপর স্থাপিত মসজিদটির ভেতরের দিকের কেবলা দেওয়ালে তিনিটি অর্ধবৃত্তাকারাকৃতির সুসজ্জিত মেহরাব আছে। মেহররাবের দু’পাশে পোড়া মাটির দিগন্ত রেখাকৃতির বাধন, বিভিন্ন প্রকার জ্যামিতিক ও ফুলের নকশা আছে। এছাড়া পোড়া মাটির ঘন্টা ও চেইন নকশা মসজিদের দেওয়াল ও ছাদ জুড়ে আছে। মসজিদের সাথেই আছে একটি বৃহদাকার দীঘি।
শুকুর মল্লিক মসজিদ
এটি একটি বর্গাকাকৃতির এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। দেখতে অনেকটা ঢাকার বিনত বিবির মসজিদের মত। মসজিদটির উভয় পাশে একটি করে বন্ধ মেহরাবসহ পশ্চিম পাশে একটি অর্ধবৃত্তাকৃতির মেহরাব
আছে। এই মেহরাবগুলোতে আছে পোড়া মাটির ঘন্টা ও চেইন নকশা। অপরুপ নকশাগুলো মানুষের হৃদয় ছুয়ে যায়।
বারবাজারের এ সকল সুদৃশ্য প্রত্নতত্ব নির্দশনের তেমন প্রচার না থাকায় পর্যটক শূণ্য থাকছে এলাকাটি। এছাড়া আবাসিক হোটেল সহ অন্যান্য সুব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের নজর কাড়তে ব্যর্থ হচ্ছে এ অঞ্চল। ফলে বর্তমান প্রজন্ম সঠিক কোনো ইতিহাসও জানতে পারছেন না। এলাকাবাসির আশা সরকারী উদ্যোগে ব্যপক প্রচারের মাধ্যমে পর্যটকদের উৎসাহী করতে পারলে এবং সরকারিভাবে মসজিদগুলোকে ঘিরে পরিকল্পিতভাবে শোভাবর্ধনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে সরকারের পাশাপাশি এ অঞ্চলের মানুষেরা আর্থিক ভাবে লাভবান হতে পারতো।

শেয়ার