রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা মাহমুদা বেগমের চোখে ৭১

92
রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা

সালমান হাসান রাজিব: একাত্তর সাল। চারিদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। একের পর এক পুড়ে চলেছে শ্যামল বাঙলার শহর গ্রাম, হাট বাজার দোকান পাট। দেশ জুড়ে পাক বাহিনির গণহত্যার বিভীষিকা। লাখে লাখে মরছে বাঙালি। দেশব্যাপি উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা। এমন দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে সামান্য এক রাজমিস্ত্রীর বউ মাহমুদা বেগম ছুটে ফিরতেন মানুষের বাড়ি বাড়ি। চেয়ে চিন্তে চাল,ডাল, তেল, নুন, তরকারি, আনাজপাতি যা কিছু মিলত, সেগুলি নিয়ে রান্না করতেন। নিজের সন্তানের মতন করে রণঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে সেসব রান্না খাবার তুলে দিতেন। কোন কোন দিন রেধে খাওয়ানোর মতন কিছুই থাকত না। সেদিন ছোলা মুসুরি কিম্বা গম ভেজে দিতেন। মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের পরনের পোশাকআশাক ধুয়ে রোদে শুকিয়ে দিতেন।

বয়সের ভারে এখন ন্যুজ্ব হয়ে পড়েছেন মাহমুদা বেগম। ঠিক মতন হাঁটতে পারেন না। কমে এসেছে দৃষ্টি শক্তিও। কিন্তু অশীতিপর এই নারী এখনও ঠিক স্মরণ করতে পারেন একাত্তরের সেই দিনগুলি। কোনরকম এদিক সেদিক হয়না। গত সোমবার মুক্তিযুদ্ধের সময় ফেলে আসা সেই দিন গুলোয় ফিরে যান মাহমুদা বেগম। তরুন প্রজন্মের কাছে সেই দিনের গল্প করেন অবলিলায়। আর এই গল্প বলার ও শোনার সুযোগ করে দিয়েছিল যশোরের মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার। সেই সাথে জনউদ্যোগ যশোর। শহরের সদর হাসপাতাল সংলগ্ন ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কার্যালয়ে স্মৃতিচারণ ১৯৭১ অনুষ্ঠানে তিনিসহ আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকালিন তাদের জীবনের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা গল্পের ঝুলি খুলে বসেন। আর বাস্তব জীবনের সেই গল্পের ভেতরে মনের অজান্তে ঢুকে যায় স্কুল কলেজ পড়ুয়া এই প্রজন্ম। অন্তত গল্প কথনের সময় তরুনদের যে পিনপতন নিরবতা, তাদের গল্প শোনার যে বিভোরতা তাই বলে দেয়। নারী মুক্তিযোদ্ধা মাহামুদার সাথেও যেন সবাই চলে যেতে থাকে সেই অগ্নিগর্ভা একাত্তরে। তখন মে মাসের মাঝামাঝি হবে হয়ত। রবিউল আলম ও কালু নামে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ কয়েকজন মুক্তি যোদ্ধা আসেন তাঁর বাড়িতে। তখন ভর দুপুর। সেখানে দুপুরের খাবার সারেন তারা। তাদের সঙ্গে আলাপ করে যুদ্ধে যোগ দেনর মাহমুদার স্বামী খোরশেদ আলী। সেই সুযোগটি নেন মাহমুদা। তিনিও প্রশিক্ষন নেন। অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। গ্রেনেড ছোড়া ও রাইফেল চালানো শেখেন। মুক্তি বাহিনীর প্রতিনিধি হিসেব বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার সংগ্রহ শুরু করেন। পাগলি সেজে, কখনো বউ সেজে আবার কখনো ভিক্ষুক ও ফেরিওয়ালা সেজে ইনফর্মারের কাজ করতেন।

একাত্তরের স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, একবার পাক সেনাদের আত্নসর্মপনের খবর  পাই। এটি জানার পর গোপনে গাছি দা নিয়ে বের হই। আত্নসমর্পন করার ঘটনাস্থলে গিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে কুপিয়ে হত্যা করি এক পাক সেনাকে।
আশির বেশি বয়সি এই নারী মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতার কথা যশোর সদরের কাশিমপুরের মধু গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে কিংবন্দন্তীর কাহিনীর মতন মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এদিকে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে একাত্তরের গল্প করেন আরেক মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার। তিনি বলেন, একাত্তর সালের কোন একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। এসময় দেখেন, তার গ্রামের বাড়ি দেয়াড়ার পাশের গ্রাম ফরিদপুরে পাক বাহিনী আক্রমন চালায়। গ্রামটিতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ৬৮ জনের বেশি মানুষ হত্যা করে পাক বাহিনী। এঘটনার পরপরই তিনি কাশিপুর সীমান্ত হয়ে ভারতের বয়রা রওয়ানা হন। তিনি খয়রাত হোসেন, আব্দুল মান্নানসহ ১৭ জনের একটি দল ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেন। এরপর প্রশিক্ষনের দশ দিনের মাথায় ২৯ মে সাতক্ষীরার ভোমরায় নতুন মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে অবর্তীন হন। এ যুদ্ধে মুক্তিসেনারা জীবীতবস্থায় একজন পাকসেনাকে ধরে ফেলে উদ্ধার করে ১৫০টি অস্ত্র। এরপর যুদ্ধ করতে চলে আসি চৌগাছা এলাকায়। গরিবপুর এলাকায় ভয়ংকর ট্যাংকের যুদ্ধ হয়। একেবারে মুখোমুখি ট্যাংক যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে সাতটি ট্যাংক হারিয়ে পিছু হটে পাক বাহিনী।

মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ও জনউদ্যোগ পাঠাগার আয়োজিত স্মৃতিচারণ ১৯৭১ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রুকুনুউদ্দোলাহ। এসময় উপস্থিত ছিলেন জনউদ্যোগ যশোরের আহবায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা ওহিদুজ্জামান চাকলাদার মুকুট প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থাপক বিথীকা সরকার।