বিভ্রম মায়া
ওয়াসিম হোসেন

গাঢ় নীল আকাশ। সেই আকাশে দক্ষিণ দিক হতে উত্তরে শিমুলের তুলোর মতো ভেসে চলছে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর ধারে মৃদুমন্দ বাতাসে দোলা লাগছে সাদা সাদা কাশফুলের শরীরে। সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যাওয়া হালকা হাওয়া, শিউলী, কামিনী, হাসনাহেনা, দোলনচাঁপা, বেলী, ছাতিম, বরই, শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরী, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা নানা জাতের ফুলের গন্ধে মৌ মৌ সে-বাতাস। রাতে তার বুকে ভর করে নেমে আসে মায়াবী জ্যোৎস্না। মোহনীয় হয়ে ওঠে চাঁদনী রাত। মায়াবী পরিবেশে আঁধারের বুক চিরে উড়ে বেড়ায় জোনাকীরা। আনন্দযজ্ঞের এই লীলানিকেতনে দিনরাত হেঁটে চলছে আত্মভোলা কদাকার বালক। বাড়ি নেই। থাকারও নির্ধারিত কোন ঠাঁই নেই। প্রকৃতিই তার চিরসঙ্গী।

আজ প্রকৃতির মায়া বালককে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বালক হাঁটছে। থামছে না। নদীর ধার ঘেষে, বন পেড়িয়ে, ফসলের সবুজ মাঠ পেছনে ফেলে আরও দূরে। দূর থেকে দূরে। রাতে চাঁদের সাথে, দিনে সূর্যের সাথে হাঁটছে। হাঁটছে তো হাঁটছেই। চলার পথে অবশেষে বালক এক সন্ন্যাসীর সাক্ষাত পেল। সন্ন্যাসী বালকের কাছে জীবনের অর্থ জিজ্ঞাসা করল? আনাড়ি বালক কিছুই বলিতে পারলো না। বরং সন্ন্যাসীর কাছেই প্রশ্নটি ছুড়ে দিলো। সন্ন্যাসী বললো, ‘বালক, এ যে কঠিন। এ যে কঠিনকর। এ যে কঠিনতম। এর উত্তর অসীম। বহু যুগ পূর্বে জীবন সম্পর্কে জানাতে গৌতম বুদ্ধ অন্নগ্রহণ ত্যাগ করে জীবনের অর্থ খুঁজেছিলেন। জীবনের সত্যিকার অর্থ জানা যে কঠিনতম।’ ‘আমি জানতে চাই’ বালকের কঠিন স্বরে থমকে গেলো সন্ন্যাসী। বললো, ‘তবে ত্যাগের ধর্মকে আলিঙ্গন করো। কারণ ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।’ এই কথা বলে সন্ন্যাসী অদৃশ্য হয়ে গেলো।

ত্যাগের দীক্ষা গ্রহন করার জন্য আনাড়ি বালক শিক্ষালয়ে ভর্তি হইল। অনেক দিন কেটে গেল কিন্তু বালক তার প্রশ্নের উত্তর খুজে পায় না। কেমন করিয়া করিতে হয় ত্যাগ? কেমনে জানা যাবে জীবনের অর্থ?
শিক্ষালয়ে এবার মা দেবীর পুজা হবে। গুরু বললেন মাকে ভক্তি করতে চাইলে তোমরা প্রত্যেকে যে যা পারো মায়ের পায়ে অর্ঘ্য দিবে। মায়ের প্রতি বৃলকের শ্রদ্ধা ও সম্মান অগাধ। তাই সে একটানা কয়েকদিন না খেয়েই টাকা বাচিয়ে, সেই টাকা মায়ের চরণে অর্ঘ্য দিল। বালকের অর্ঘ্য মায়ের কাছে সেটা কিছুই না। কিন্তু বালকের কাছে সেটা ছিল অনেক ত্যাগের। আড়ম্বর আয়োজন শেষেও, বালক তার প্রশ্নের উত্তর পায় না। যাকে ভালবেসে কয়েক দিন না খেয়েই দিয়েছিলো অর্ঘ্য। তার কাছে থেকে উত্তর না পেয়ে; পুজোর দিনও অন্নপান করল না সে। অগাধ বিশ্বাসের মায়ের পুজোর প্রতিমাটি ছিলো মাটির তৈরি ! তার হৃদয় ছিল না। অভাগা বালকের প্রতি তার সদয় হইল না। ক্ষুদার্থ বালকের কানে ভেসে আসল রবীন্দ্রনাথের কথা,

‘এ শুধু অলস মায়া— এ শুধু মেঘের খেলা,
এ শুধু মনের সাধ বাতাসেতে বিসর্জন,
এ শুধু আপনমনে মালা গেঁথে ছিঁড়ে ফেলা,
নিমেষের হাসি কান্না গান গেয়ে সমাপন।
ভুলে ভুলে গান গাই কে শোনে কে নাই শোনে… ‘