বিবর্তন যশোরের আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব

বিবর্তন যশোরের আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব উদ্বোধন

বিবর্তন যশোর আয়োজিত তৃতীয় আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ বলেছেন, যান্ত্রিক পরিমন্ডলে জীবনযাপন আর যন্ত্রনির্ভরতা আমাদের পূর্ণপ্রাণ নিশ্বাস নিতে ক্রমাগত বাধাগ্রস্থ করছে। জীবনের জন্য সুবাতাস নেয়ার জায়গা হচ্ছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। আমাদের ঐতিহ্যময় সংস্কৃতি আমাদের সুস্থতার জন্য সুবাতাস দেবে। জীবনকে আলোকিত করবে। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাত দিন ব্যাপি নাট্যোৎসবের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় তিনি আরো বলেন, যশোরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রাচীন। এখানে শতবর্ষী নাটকের মঞ্চ রয়েছে। এখানকার গ্রামে পহেলা বৈশাখের গ্রামীণ মেলা লোকজীবনের একটি পুরোনো ধারা প্রচলিত ছিল। সময়ের অগ্রযাত্রায় আবার এখান থেকেই মঙ্গলশোভাযাত্রা দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। এই শোভাযাত্রা ও মেলার ব্রান্ডিংয়ে যশোর দাবিদার হতে পারে। স্থানীয় সাংস্কৃতি কর্মীদের এব্যাপারে ভূমিক নিতে হবে।
নাট্যোৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সানোয়ার আলম খান দুলু। জাতীয় সংগীত ও প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে নাট্যোৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী আলোচনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আতিকুজ্জামান রনি। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন বিশেষ অতিথি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুল হান্নান মিয়া, যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ, পুলিশ সুপার মঈনুল হক ও বিবর্তন যশোরের উপদেষ্টা হারুণ অর রশীদ।
উদ্বোধনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি ও সমবেত সংগীত পরিবেশিত হয়। এতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা অংশ গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিলা রানি দাস।
এরপর লিয়াকত আলী লাকীর নির্দেশনায় বুদ্ধদেব বসু’র গল্প অবলম্বনে নাটক আমরা তিন জন মঞ্চায়িত হয়। আজ সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হবে সাধনা আহমেদ রচিত বিবর্তন যশোরের নাটক মাতব্রিং।

নাটকের কাহিনী সংক্ষেপ:
১৯২৭ সালর ঢাকার পুরানা পল্টন। বিকাশ, অসিত এবং হিতাংশু তিনবন্ধু। দিনের বেশিরভাগ সময় তিনবন্ধু একসঙ্গে থাকে, যতটা এবং যতক্ষণ থাকা সম্ভব। তিনবন্ধু একে অপরের প্রেমে পড়ে আবার তিনজনই একসঙ্গে অন্য একজনের প্রেমে পড়ে, নাম তার-অন্তরা, বাড়ির সবাই ডাকে তরু বলে, তবে তিনবন্ধুর কাছে মেয়েটির নাম হয়ে যায় ‘মোনালিসা’।
একদিন কাকতালীয়ভাবে রাস্তায় তাদের সাথে দেখা হয় মোনালিসা ও তার বাবা-মা’র। মোনালিসার বাবা দে সাহেব তাদেরকে বাসায় আমন্ত্রণ জানায়। বৃষ্টিমুখর একটি দিনে তারা মোনালিসার বাড়ি যায় । কিন্তু মোনালিসার সাথে তেমন কোন কথা হয়না। এর মধ্যেই মোনালিসা টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়, তিনবন্ধুর ভীষণ মন খারাপ। মোনালিসার বাবা-মা তাদের সহায়তা চাইলে দিনরাত প্রায় একমাস পরিশ্রম করে তারা মোনালিসাকে সুস্থ করে তোলে। মেয়েটির সাথে তাদের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। তারপর একদিন মোনালিসা ভালো হলো এবং চলে যায় রাঁচি। ঠিকানা রাখেনি বলে তিনবন্ধুর খুবই মন খারাপ হয়। তবে যেদিন ওরা ফিরল, সেদিন স্টেশনে কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি আর লালচে মুখায়বয়বের মোনালিসাকে দেখে তিনবন্ধু মুগ্ধ হয়। ট্রেনের মধ্যে মোনালিসা’র সেকি গল্প, দেখতে দেখতে তিনবন্ধু চারজন হয়ে উঠলো। হঠাৎ একদিন মোনালিসার মা তাদেরকে ডেকে জানায় মোনালিসার বিয়ের সংবাদ। খবরটি শুনে তিনবন্ধু হতম্ভব হয়ে যায়। বিয়ের পর মোনালিসা চলে যায় কলকাতা। একদিন হঠাৎ জানা গেলো মোনালিসা ঢাকায় আসছে এবং সে অন্তঃসত্ত্বা। তিনবন্ধু মোনালিসাকে ঘিরে থাকে সবসময়। ও যাতে ভালো থাকে, কখনো মন খারাপ না করে, সেই চেষ্টাতেই দিন কাটে তিনবন্ধুর। এক অমাবশ্যার রাতে প্রসব বেদনায় ছটফট করতে থাকে মোনালিসা। মোনালিসার চাপা কান্না তিনবন্ধুর বুক বিদীর্ণ করে দেয়। শীতের রাতে, মাঠের মধ্যে, না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, অদৃষ্টের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনবন্ধু রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা করতে থাকে। ভোরের প্রথম ছাইরঙা আলোয় ওরা দেখতে পায় দে সাহেবের বেদনার্ত নির্বাক মুখ। রাশি রাশি ফুল আরো কত কিছু দিয়ে সাজানো হলো মোনালিসার শবদেহ। তারপর মোনালিসার অন্তিম যাত্রা।

নির্দেশকের কথা
যখন যে কাজটি করি, মনে হয় এটিই আমার প্রিয় কাজ, অনেক ভালবাসার, অনেক আদরের। ‘আমরা তিনজন’ নাটকের বেলাও তাই হয়েছে। সময়ের ফাঁকে ফাঁকে গল্পটা নিয়ে স্বপ্ন দেখি, কল্পনার রাজ্যে করি বিচরণ। বুদ্ধদেব বসু আমার প্রিয় মানুষ, প্রিয় কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। তাঁর ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’ মঞ্চস্থ করেছি অনেক সাহস করে। অনেকেই সাহস পায়নি। নাটকটি নন্দিত হয়েছিল। মোনাকোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবে আন্তর্জাতিক নাট্য দর্শকদের কাছে হয়েছিল বিশেষভাবে সমাদৃত। কলকাতা, নেপাল, আগরতলাতেও হয়েছিল প্রশংসিত। ষাটের দশকের ‘নাটক পাগল ছেলে’ বছরে তিনটি-চারটি নাটক না করলে হতো না। নাটকের মধ্যে বসবাস। মঞ্চ নির্মাণে মহানন্দ, মঞ্চ ভেঙ্গে ফেলার সময় হৃদয়ে হতো রক্তক্ষরণ। দেখতে দেখতে চৌষট্টি সাল থেকে বাহাত্তর সাল পর্যন্ত পঁচিশটি নাটক হয়ে গেলো। তারপর জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, লোক নাট্যদল, পিপল্স লিট্ল থিয়েটার, পিপল্স রেপার্টরি থিয়েটার, রাখাল, শিল্পকলা একাডেমি’র প্রযোজনা নিয়ে চুরাশিটি নাটকের নির্দেশনা।
গত বছরের স্বপ্নের কাজ প্রত্ননাটক ‘মহাস্থান’, এবছর ‘আমরা তিনজন’ গল্পটি পড়ার পর থেকেই নাটক করার ভাবনা আমাকে তাড়িত করে। অন্য দু’টি নাটক ভাবনায় থাকলেও মাথা থেকে সরিয়ে দেয় ‘আমরা তিনজন’। গল্পটা বারবার পড়ি আর রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে তার আবহ তৈরি হয়ে যায়। নাটকের ক্যানভাসে প্রবেশ করার দারুন বাসনা অনুভব করি। নির্মিত হয়ে যায় একটি চরিত্র, অভিনেতা হিসেবেও যুক্ত হয়ে যাই। ষাটের দশকের ঢাকার স্মৃতি আমায় প্রাণিত করে। অন্যরকম প্রেমানুভূতিতে আবিষ্ট হই। বুদ্ধদেব বসু’র মতো জিনিয়াসের সান্নিধ্য অনুভুত হয়। সাথে পাই প্রিয় ঋতু বর্ষার স্মৃতি। রবীন্দ্রনাথ সাহস দেয়। নির্মিত হয়ে যায় দৃশ্যকাব্য ‘আমরা তিনজন’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here