বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া জরুরী: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

0

যে মানুষটির শরীরে পোষাক নাই তার স্বাভাবিক চিন্তা হবে পোষাক কেনার সামর্থ্য অর্জন করা। যে মানুষটির খাবার নাই তার প্রথম লক্ষ্য হবে খাবারের সংস্থান করা। অর্থনীতির ভাষায় যাকে আমরা বলতে পারি সীমিত সম্পদের মধ্য থেকে অসীম চাহিদার অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা গুলো মিটানো। যে সুতি কাপড় সামর্থ্য অজন করেনি এবং চেষ্টাও করেনা তার জামদানির চিন্তা করা বা যে একবেলা খেতে পারেনা তার তিন বেলা বিরিয়ানির স্বপ্ন শুধুই স্বপ্ন হতে পারে সম্ভাবনা হতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা নিয়ে আমাদের নানা কথা থাকতে পারে তবে সময়ের চাহিদায় বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হওয়া উচিত?

১৮ বছর বয়সের শক্তি, সাহস এবং সম্ভাবনা নিয়ে কারোই কোন সন্দেহ নাই। আর তাই কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সহ সকল সচেতন মহল এই সময়কে কাজে লাগানোর প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন। একই সাথে গ্রন্থগত বিদ্যা থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাবহারিক শিক্ষার পরিবেশ তৈরীর দাবী অনেকের। কিন্তু জাতির সবচেয়ে ক্ষতির বিষয় হচ্ছে, এই ১৮ বয়সের মূল্যবান সময়কে কাজে না লাগিয়ে, না লাগার পরিবেশ তৈরী করে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক কাঠামো সহ সার্বিক উন্নয়ন কাঠামোকে দুর্বল করে ফেলছি। বাংলাদেশে বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র-ছাত্রীর স্বাভাবিক বয়স তুলনা করলে ১৮ বয়সের সামান্য আগে বা পরে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয় কিন্তু এই সম্ভাবনাময় সময়কে বিশ্ববিদ্যালয় সাফল্যের শক্তিতে পরিণত করতে পারছেনা যার নেতিবচক প্রভাব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে দেখতে পাই। সকল শিক্ষার্থীর মেধা, সৃজনশীলতা ও আগ্রহ থাকা স্বত্তেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী কোন না কোন ভাবে ঝরে পড়ে। একটি হিসাবের দিকে তাকালে বিষয়টির ভয়ংকর সত্যতা ফুটে উঠবে ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন শিক্ষার্থীর উপর অনুসন্ধান চালালে দেখা যায় ৬০% শিক্ষার্থী পরীক্ষার পূর্ব ব্যাতিত সিলেবাস বা সিলেবাসের বাইরে তেমন কোন পড়াশুনাই করে না। এরা অনেক বেশী বিনোদনমুখী এবং অপ্রয়োজনীয় কাজে তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সময়কে নষ্ট করে।
১০% ছাত্র-ছাত্রী পরীক্ষার ১ বা ২ মাস আগে থেকে সিলেবাসের পড়াশুনা করে। এবং সারা বছরের বাকী সময় গুলো কাজে লাগার মত তেমন কিছুই করেনা।
১৫% ছাত্র-ছাত্রী ২বা ৩ মাস আগে থেকে সিলেবাসের উপর পড়াশুনা করে। যদিও এক্ষেত্রে শুধু তাদের ফলাফল ভালো করার ইচ্ছাই প্রধান।
আর বাকী ১৫% ছাত্র-ছাত্রী প্রায় সারা বছর স্যারদের কাছে ভালো হবার জন্য , ভালো ফলাফল করার জন্য বা শিক্ষক হবার করার জন্য সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশুনা করে।
প্রত্যেক গ্রুপে ০-৮ ভাগ ব্যতিক্রম আছে যারা সিলেবাসের পড়াশুনার সাথে বাইরের সৃজনশীল কাজে নিজেকে জড়িত রাখে, সৃজনশীল চিন্তা এবং কাজ করার চেষ্টা করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা, গবেষণা ও সমাজের কাজে লাগানোর কথা থাকলেও আমাদের জ্ঞান তৈরী করাও হয় না। কাজের মূল্যবোধও তৈরী করা হয়না। যার ফলে সমাজে সম্ভাবনাগুলো কমে আসছে। যে বয়সে আমাদের উদ্যোমী আর পরিশ্রমী হবার কথা, সে সময়টা আমরা বিশেষ কোন কাজেই লাগাতে পারছিনা। আমরা যতেষ্ট আগ্রহ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শুরু করি এবং যতেষ্ট হতাশা নিয়ে বের হই। সম্মান পর্যায়ের শিক্ষার্থীগন সমাজের সবচেয়ে বেশী কাজে লাগতে পারে কিন্তু সেই শক্তি কাজে না লাগানোর ফলে আমাদের সমাজে সম্ভবনাময় খাত নষ্ট হচ্ছে! নষ্ট হচ্ছে দেশের মূল্যবান সম্পদ।
বাজেটে উৎপাদনশীল সম্ভাবনাময় খাত গুলোতে জোর দিতে হবে এবং তার দীর্ঘমেয়াদী মুনাফা বা সেবা যেন সাধারণ মানুষ পায় তার ব্যাবস্থা থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতিতে কিছু বিশেষ পরিবর্তন অবশ্যই আনতে হবে এবং হবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ব্যাবস্থা গুলো পরিবর্তন হলে জাতির ইতিবাচক পরিবর্তন হবে সে সমন্ধে আমার কিছু সুপারিশ আছে।

সুপারিশ ১: বাস্তব অবস্থায় এটা মানতেই হবে আমরা জীবনের সম্ভাবনাময় সময়গুলো প্রয়োজনের চাইতে অপ্রয়োজনেই বেশী ব্যায় করি আর তাই এ সময়কে কাজে লাগানোর জন্য সবার জন্য বাধ্যতামূলক ৩-৪ মাস শ্রমের ব্যাবস্থা করতে হবে। বিষয় ভিত্তিক কাজ থাকলে সেগুলো তা না থাকলে যে কোন কাজে।
সুপারিশ ২: বিশ্ববিদ্যালয়কে ইংরেজি মাধ্যমে করার চেষ্টা না করে সম্পূর্ণ বাংলায় করতে হবে। ইংরেজি সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভাষায় কিছু দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরী করতে হবে যাতে করে তারা সকল দরকারী বই গুলো সহজ অনুবাদ করে আমাদের সরবরাহ করতে পারে।
সুপারিশ ৩: বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে তাদের অধিকার নিশ্চিতে প্রতি ৪ বা ৬ মাসে আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে প্রশাসনকে দ্বায়বদ্ধ রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে।
সুপারিশ ৪: শিক্ষকদেরও রাজনীতি সংশ্লিষ্টতা বন্ধ করার পাশাপাশি প্রশ্নপত্র এবং ফলাফল তৈরীতে তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ বন্ধ করতে হবে। এতে করে শিক্ষক নিয়োগের বা শিক্ষাদানের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
সুপারিশ ৫: শিক্ষার্থীর উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত চিন্তার ও প্রতিভার বিষয়টি বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় নির্ধারণ করাতে হবে।

মোঃ নূরুনবী ইসলাম
এলএল.এম(অধ্যয়নরত)
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,কুষ্টিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here