‘বইয়ের মইদ্যে মধু আছে’ -সুজন দেবনাথ

২০০১ সাল। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হচ্ছে। অনেক নতুন নতুন জিনিস আসছে সামনে। তেমনই একটি নতুন জিনিস হলো ট্রেন ভ্রমণ। ভর্তি পরীক্ষা দিতে সিলেট যাবার সময়ই আমি জীবনে প্রথম ট্রেনে উঠি। ছোটবেলায় আমার কাছে ট্রেন মানে ছিলো শুধু বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’। রেললাইন দেখতে গিয়ে অপু-দুর্গার হারিয়ে যাওয়া। আর ঢাকায় কলেজে এসে ট্রেন মানে হলো মালিবাগ রেলক্রসিং। রামপুরা থেকে রিক্সায় নটরডেম কলেজে যাওয়া-আসার পথে মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে কম হলেও ২০ মিনিট বসে থাকতে হতো। সেই বিশ মিনিট আমরা গালিচর্চা করতাম। নতুন শিখা সুন্দর সুন্দর ঢাকাইয়া গালি। আমাদের প্রতিভায় রেলের বাপ-মার ২৮ গুষ্টি উদ্ধার হয়ে যেত। আমার মনে হয় এই রেল-ক্রসিংগুলোর কারণে ঢাকার বেশির ভাগই মানুষই ট্রেনবিদ্বেষী।

সেই ট্রেনবিদ্বেষী আমাকে সিলেট শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই দিলো না, প্রথম ট্রেনে যাত্রার সুযোগও দিলো। ট্রেনগুলোর নামও খুবই সুন্দর। আন্তঃনগর পারাবাত, জয়ন্তিকা, উপবন, সুরমা মেইল। প্রতিটি নামই শিল্পমাখা। প্রথম ট্রেন যাত্রায় আন্তঃনগর পারাবাতে কু-ঝিক-ঝিক করতে করতে একেবারে সময়মত সিলেট গিয়ে পৌঁছলাম। ট্রেনবিদ্বেষী আমি রাতারাতি হয়ে গেলাম মোটামুটি একজন ট্রেনপ্রেমী।

তবে যতোই ট্রেনপ্রেমী হই না কেন – কমলাপুরে এসে আমাকেও প্রায়ই বলতে হতো, ‘জনাব, ছয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে’? ছয়টার ট্রেন প্রায়ই নয়টায় ছাড়তো। আর এই সময়টুকু কাটানোর সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে স্টেশনের খবরের কাগজের দোকান। সেখানে পত্রিকা, ম্যাগাজিনের সাথে অনেক ভালো বইও থাকতো। ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেলো। ট্রেনে ওঠার আগে রেলস্টেশন থেকে বই কিনতে হবে। সেই খুব হিসেব করে চলা সময়ে এটা ছিলো আমার মোটামুটি একমাত্র বিলাসিতা। এই বিলাসিতাটুকু করতে গিয়ে কমলাপুর স্টেশনের খবরের কাগজের একটি দোকানে আমি একজন বাঁধা কাস্টমার হয়ে গেলাম। দোকানী আমাকে বেশ খাতির করে, ডিসকাউন্ট দেয়। যতদূর মনে আছে তার নাম আলী মিয়া। সে আমাকে নতুন নতুন বইয়ের খোঁজও দিতো। নাম বলে দিলে পরের বারের জন্য এনে রাখতো। স্টেশনে আলী মিয়াই ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয় সুহৃদ।

ছোটবেলা থেকেই আমি খুব পছন্দের কোন বই পেলে কিছুক্ষণ বইয়ের গন্ধ নিতাম। সেটা দেখে আলী মিয়া বলতো, ‘বইয়ের মইদ্যে মধু আছে, বেবাক্কে জানে না’। সে আমাকে অনেক মধু দিয়েছে। ডেল কার্নেগির রচনা, শেক্সপিয়ারের ট্রাজেডি, বিভূতিভূষণ রচনাসমগ্র, বনফুলের গল্প – আমার অনেক বই ঐ দোকান থেকে কেনা। আমার ট্রেন ভ্রমণের একটা সুন্দর আনন্দময় অংশ ছিলো ঐ দোকানটি।
মাঝখানে অনেক বছর ট্রেনে আসা-যাওয়া হয় নি। অনেক দিন পরে একদিন আবার কমলাপুর স্টেশনে গিয়ে আলী মিয়ার কথা মনে পড়লো। গেলাম সেই সংবাদ পত্রের দোকানে। দোকান আছে, কিন্তু আলী মিয়া নেই। এখনকার দোকানী তাকে চিনেই না। মনে হলো, একজন কাছের মানুষ বুঝি দূরে চলে গেছে। কিন্তু দোকানে বইয়ের দিকে তাকিয়ে একেবারে চমকে উঠলাম। মাত্র কয়েকটা বই অযত্নে কোনায় পড়ে আছে। সেগুলো রান্না শিক্ষার বই, ধর্মীয় বই, শিশুদের অ-আ বই, ত্রিশ দিনে কোরিয়ান ভাষা শিক্ষা বই। উল্টাদিকে আছে ২৪ ঘন্টায় কম্পিউটার শেখার বই। একটা লাল ম্যাগাজিনের নিচে উঁকি দিচ্ছে রগরগে যৌন-ছবির মলাট। আর আছে কিছু রাজনীতি ও বিনোদন ম্যাগাজিন। কিন্তু কোন সাহিত্য বই নেই। একটাও নেই। আমি পাশের দোকানে গেলাম। সেখানের অবস্থা আরও খারাপ। কদিন পরে মফস্বলের কিছু বইয়ের দোকানে গেলাম। সেখানেও কোন সাহিত্য বই নেই। এর মানে সমাজে বই পড়ার ধরনে বড় রকম পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই কয়েক বছরে এমন কিছু ঘটেছে যে, সাধারণ দোকান থেকে সাহিত্য বই, মননশীল বই হাওয়া হয়ে গেছে!
.
সেই দোকানটার কথা মনে পড়লে আমার ভেতরটা হু হু করে ওঠে। আহমদ ছফা লিখেছিলেন, প্রফেসর আব্দূর রাজ্জাক নাকি কোন দেশে গেলে অবশ্যই সাধারণ বইয়ের দোকানে যেতেন। বইয়ের ধরণ দেখে বুঝতেন, সেই দেশের সমাজ কোন দিকে যাচ্ছে। হুম, মানুষ এই মুহূর্তে কি বই পড়ছে, সেটাই সমাজকে বুঝার সবচেয়ে ভালো মাপকাঠি। তো সেই মাপকাঠিতে আমরা এখন কোন দিকে যাচ্ছি?
আমরা মনে হয় এখন আর বই পড়ছি না! পড়লেও শুধু অতি দরকারী বই পড়ি। চোখ খোলার বই পড়ি না। বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’র কথা মনে পড়ছে। আমাদের পাঠকদের মনে হয় সত্যিই মৃত্যু হয়ে গেছে। কিন্তু সময়মতো চোখ খোলার জন্য একমাত্র সঠিক মাধ্যম বই। তাই ছেলে-মেয়েকে, ভাই-বোনকে বই কিনে দিন। ভালো বই, মননশীল বই। চোখ খোলার বই। শুধু মোবাইলের স্ক্রিনে সারাদিন চোখ রাখলে হালকা, চটুল জিনিসেই চোখ অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। মন খুলবে না। পাখনা গজানোর দিনগুলোতে তাদেরকে পথ দেখাতে ভালো বইয়ের কোন বিকল্প নেই। কমলাপুর রেলস্টেশনের সেই হারিয়ে যাওয়া আলী মিয়ার থেকে ধার করে বলছি, ‘বইয়ের মইদ্যে মধু আছে, বেবাক্কে জানে না’।

লেখক: ফাস্ট সেক্রেটারী, বাংলাদেশ দূতাবাস, এথেন্স, গ্রিস