নিকষ কালো সময়: মাহমুদা রিনি

নিকষ কালো সময়: মাহমুদা রিনি

যশোর সদর হাসপাতালে মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। রাত প্রায় ন’টা বাজে। আমরা সাত আটজন। কিছুক্ষণ আগে কারবালা ধোপাপাড়া থেকে মহিলা পরিষদের এক কর্মী ফোন করে জানালেন, আট বছর বয়সের একটা মেয়ে ধর্ষণের পর খুন করে বস্তায় ভরে পুতে রেখেছিল। খুঁজে পেয়ে আমরা পুলিশে খবর দিয়েছি। এখন হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

মেয়েটি গতকাল বিকালে পড়া শেষ করে মাকে বলে খেলতে গিয়েছিল আর ফেরেনি। সারারাত খোঁজাখুঁজি, মাইকিং করেও কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। পাড়ার ভিতরেই একটা ছোট গর্ত ছিল, সেটা বন্ধ এবং উপরে কচুর পাতা দেখে হঠাৎই একজনের সন্দেহ হয়। একটু খুঁড়তেই বস্তা পাওয়া যায় আর বস্তার ভিতর হাত পা বাধা অবস্থায় মেয়েটির লাশ।

মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়েছে। মুখের ভিতর গলা পর্যন্ত আস্ত একটা প্যান্ট ঢুকিয়ে দেয়ার ফলে মুখটা বিকৃত প্রায়! মলদ্বার ছিন্নভিন্ন। শরীরে রক্ত জমা আর কাদামাটিতে গায়ের রঙ বোঝার উপায় নেই। হাত পা দুমড়িয়ে মুচড়ে গোল করে বেধে বস্তায় ঢোকানো হয়েছে।

আমরা পৌঁছানোর আগে লাশ মর্গে ঢুকে গেছে। রাতে পোস্টমর্টেম হবে না। আমরা যখন দাঁড়িয়ে আছি দায়িত্ব প্রাপ্ত কেউ এসে তালা খুলে আমাদের দেখাবে বলে ঠিক তখনই আরেকটি লাশ আসলো। একটি মেয়ে, বয়স তিরিশের কম হবে। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। একটা বাচ্চাও আছে। এই মেয়েটিকেও ভিতরে ঢুকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর আমরা ভিতরে ঢুকলাম।

এই দৃশ্য লিখতে হাত সরছে না তবু লিখছি। একই টেবিলে মহিলাটির পাশে মেয়েটি। যেন মা তার মেয়েকে কোলের মধ্যে নিয়ে শুয়ে আছে। মা- মেয়ের এই পরম শান্তির ঘুম যেন আমাদের বিবেককেও ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। নইলে নিত্য যেদেশে এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, সেখানে এখনো কিছু মানুষ প্রকাশ্যে মহিলাদের নিয়ে ব্যঙ্গ, তামাশা করে।

আসলে আমি লিখতে পারছি না। একটা আট বছরের ফুটফুটে মেয়েকে এভাবে জীবন দিতে হলো কেন? সে বুঝলো না তার কি অপরাধ! সে জানে না তার শরীরে কি আছে যার জন্য তাকে এভাবে মরতে হবে! আর এর কারণ যদি যৌন লালসা হয় তাহলেও তা মেটানোর জন্য খুব অল্প পারিশ্রমিকে জীবনের সর্বস্ব ত্যাগ করে যৌন সেবা দিয়ে যাচ্ছে নারীরাই। যারা এই সমাজে অবাঞ্ছিত। তারপরও কেন এমন ঘটনা ঘটেই চলছে নিত্যদিন?
মনোবিশেষজ্ঞ গন কি বলেন? এ জাতির মস্তিষ্ক বিকৃতি হয়ে গেছে? সৃষ্টি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে? কিছু বলুন সবাই, সোচ্চার হোন!

নাকি মাদকের নেশা এর জন্য দায়ী? একটা মানুষ কিভাবে সুস্থ মস্তিষ্কে এরকম একটা বাচ্চাকে এভাবে মারতে পারে? আমার মাথায় আসে না! সে কি তাহলে মাদকাসক্ত? অপ্রকৃতস্থ? কোথায় সমস্যা? এই ছেলেটা তো হিংস্র হয়ে জন্মায়নি। কেন এমন হিংস্র হয়ে উঠলো? এর পিছনের রহস্য খুঁজে বের করতে হবে। সব পুরুষ নিশ্চয়ই খারাপ না তবে লজ্জা সবার।
(৪ তারিখ রাতের ঘটনা)

লেখক: মাহমুদা রিনি
অর্থ সম্পাদক
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, যশোর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here