ধন্য মায়ের নিমাই ছেলে

73
ধন্য মায়ের নিমাই ছেলে

শ্রী গৌরাঙ্গ ফাল্গুনি পূর্ণিমাতে নদিয়ায় নিজের আবির্ভাব ঘটান, কিম্বা নদিয়ার ভাবের ভাষায় গৌর নদিয়ায় ‘অবতরণ’ করেন। জননী শচিদেবী সন্তানের নাম রেখেছিলেন ‘নিমাই’, তাঁর ফর্শা চেহারার জন্য পাড়ার লোক নাম দিয়েছিল ‘গোরা’ (গৌরাঙ্গ), গুরু নাম দিয়েছিলেন কৃষ্ণচৈতন্য, সেখান থেকে চৈতন্য। তিনি নদিয়ার প্রথম ‘ফকির’। নদিয়ার সাধকদের কাছে শ্রীচৈতন্য ‘ফকির’ বলেই প্রসিদ্ধ।

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার ফকির লালন শাহ তাঁর জীবদ্দশায় নদিয়ার ফকিরদের নিয়ে যে বিখ্যাত ‘সাধুসঙ্গ’ প্রবর্তন করেছিলেন, সেটাও ফাল্গুনি পূর্ণিমাতেই। তিনি ফাল্গুনি পূর্ণিমার এই দিনটি নদের নিমাইয়ের আবির্ভাব মূহূর্ত হিশাবে স্মরণ করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। নদিয়ার প্রথম ফকির শ্রীগৌরাঙ্গের আবির্ভাব তিথি উদযাপনের আনন্দ হিসাবে দিনটির গুরুত্ব ছেঁউড়িয়ায় অপরিসীম। নদিয়ার ফকিরদের জন্য এটা উৎসবের দিন।

দোলের তিথিতে হয় বলে এটাই অনেকের কাছে ‘দোল’ বা দোল উৎসব’ নামে পরিচিত। কিন্তু গৌর পূর্ণিমার তাৎপর্য ভুলে গেলে এই উৎসবের কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। এ সময় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় প্রতিবছর লাখ লাখ লালন অনুসারী, ভক্ত, অনুরাগী ও পরমার্থিক প্রেমের কাঙ্গাল নানান মনের আশেকান ছেঁউড়িয়ায় সাঁইজীর ধামে আসেন। যেহেতু তিথিটি একই সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের দোল উৎসবের সঙ্গে জড়িত তাই একে গৌরপূর্ণিমার সাধুসঙ্গ না বলে সাধারণত ‘দোল উৎসব’ বলা এখন রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। এই নামেই এর লৌকিক পরিচিতি দাঁড়িয়ে যায়। ফলে গৌরের আবির্ভাবের আনন্দ হিশাবে নদিয়ার ফকিরদের যে ‘সাধুসঙ্গ’ ও উৎসব তার তাৎপর্য ক্রমে ক্রমে আড়াল ও ফিকে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

এটা মনে রাখা দরকার গৌরপূর্ণিমায় ফকির লালন শাহের প্রবর্তিত সাধুসঙ্গ কোন ধর্মীয় কিম্বা ধর্ম সম্প্রদায়ের উৎসব নয়। এটা একান্তই নদিয়ার প্রথম ‘ফকির’ হিশাবে গৌরাঙ্গের আবির্ভাব উদযাপন। সেই উদযাপন একান্তই ‘সাধুসঙ্গ’ কিম্বা ফকিরদের মিলন মেলা হিশাবে। এই দিক থেকে ছেঁউড়িয়ায় গৌরপুর্ণিমার ভাবগত তাৎপর্য অনেক গভীর।

অপরদিকে ফাল্গুনি পূর্ণিমা তিথি শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নয়, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বিদেরও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিন। যিনি ধর্মভেদ মানেন না সেই লালন ফকির কেন একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় তিথিতে তাঁর ‘সাধুসঙ্গ’ স্থির করেছিলেন তা নিয়ে অনেকবার অনেকেই প্রশ্ন করেছেন। এই প্রশ্ন ওঠার কারন হচ্ছে ছেঁউড়িয়ার অনুষ্ঠান যে আসলে ‘দোল’ কেন্দ্রিক নয় সেই তথ্য না জানা এবং তার ভাবগত তাৎপর্য না বোঝার ফল। নবপ্রাণ আখড়াবাড়ির অনুষ্ঠানে এ নিয়ে আমরা অনেকবার আলোচনা করেছি।

আবারও বলি, নদিয়ার ফকিরদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব একান্তই গৌরের আবির্ভাব মূহূর্ত হবার কারণে। শ্রীকৃষ্ণের নানান রূপ আছে, তাঁর লীলার নানান বৈচিত্র আছে। সেই সকল লীলার ব্যাখ্যাও বিভিন্ন ও নানামুখী; ধর্মবিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান এবং জীবনযাপন ভেদে বিভিন্ন। তবে রাসলীলা, হোলি বা রঙ খেলা, কিম্বা কৃষ্ণের গোপিনীদের সঙ্গে লীলা নদিয়ার ভাবচর্চার অন্তর্গত নয়। নদিয়া যুগল ভজনা করে, ষোল শত গোপিনী নিয়ে লীলার কোন তাৎপর্য নদিয়ায় নাই। রাস নিয়ে ফকিরদের কোন কালাম বা গান নাই। উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে বঙ্গ এই দিক থেকে একদমই আলাদা।

শেয়ার