কোটা আন্দোলন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ তম ভিপি নুরুল হক নুর

২৫ তম ভিপি নুরুল হক নুর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদ্য নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হকের জন্ম পটুয়াখালীর গলাচিপার এক প্রত্যন্ত চরে। শৈশব কেটেছে সেখানেই। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যুক্ত হন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। গত বছর কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে প্রথম সারির নেতা ছিলেন নুরুল। ছাত্রলীগের হাতে বেধড়ক পিটুনির পরও আন্দোলনে অনড় থাকায় ছাত্রদের নজর কাড়েন তিনি।

তবে মামলা-হামলা এখনো পিছু ছাড়েনি নুরুল হকের। ডাকসুর নির্বাচনের দিনও একটি মামলার আসামি হয়েছেন। এদিন রোকেয়া হলে ভোটের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে মারধরের শিকার হন। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগে মামলাও হয়েছে। আর নির্বাচিত হওয়ার পরদিন ছাত্রলীগের ধাওয়া খেয়েছেন।

নুরুলের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপার এক প্রত্যন্ত চর বিশ্বাস গ্রামে। তাঁর বাবা ইদ্রিস হাওলাদার চর বিশ্বাস বাজারে একটি খাবারের দোকান চালান। মা নিলুফা বেগম ১৯৯৩ সালে মারা যান। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর বড় ভাই ঢাকায় ব্যবসা করেন, ছোট ভাইও সেই ব্যবসায় যুক্ত। বিয়ে হয়েছে দুই বোনের। নুরুলও বিবাহিত। স্ত্রী মরিয়ম আক্তার ঢাকার কবি নজরুল কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী। পাশাপাশি তিনি উত্তর চর বিশ্বাস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।

নুরুলের বাবা মো. ইদ্রিস হাওলাদার বলেন, গ্রামের বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন নুরুল। পরিবারের টানাপোড়েনের কারণে নুরুলকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এক চাচাতো বোনের কাছে। গাজীপুর থেকে নুরুল এসএসসি এবং ঢাকার উত্তরা মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ভর্তি হন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। মুহসীন হল ছাত্রলীগে যোগ দেওয়ার পর মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক উপসম্পাদকের পদ পান।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগের একাধিক হামলার শিকার হন নুরুল হক। গত বছরের ৩০ জুন ছাত্রলীগের হাতেই বেদম মার খেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন এক শিক্ষকের পা। সেই চরম পরিস্থিতিতে অসহায় নুরুলের ছবি সারা দেশে আলোচিত হয়। গত বছরের ৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি হয়। এরপর সেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সহযোগীদের নিয়েই ডাকসুতে লড়তে আসেন নুরুলেরা।

ডাকসু নির্বাচন চলাকালে রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষকে লাঞ্ছনা ও হলের ভেতর নির্বাচন ব্যাহত করার অভিযোগে মারজুকা রায়না নামে হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী নুরুলসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে শাহবাগ থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও ৩০-৪০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার অন্য ছয় আসামিরা হলেন লিটন নন্দী, খন্দকার আনিসুর রহমান, উম্মে হাবীবা বেনজির, শেখ মৌসুমী, শ্রবনা শফিক ও আকতার হোসেন। তাঁরা সবাই ডাকসু নির্বাচনের বিভিন্ন পদে প্রার্থী হয়েছিলেন। মামলায় দণ্ডবিধির যেসব ধারার উল্লেখ রয়েছে, তাতে কোনো নারীর শালীনতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে হামলা, নির্বাচনে অযৌক্তিক প্রভাব প্রয়োগ, নির্বাচন সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতিদানের কথা উল্লেখ আছে।

মামলার বিষয়ে পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, ‘আসামিদের পুলিশ খুঁজছে বা পেলেই গ্রেপ্তার করবে এমন কিছু না। এখন সেই মামলার তদন্ত চলছে।’

টিএসসিতে নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হককে বরণ করে নেয় ছাত্রলীগ। সন্ধ্যায় ফলাফল বাতিল করে ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নুরুল হক। রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ জিনাত হুদা বলেন, নুরুল ও অন্য প্রার্থীরা হঠাৎ করে রোকেয়া হলে ঢুকে অশ্রাব্য ভাষায় তাঁকে ও তাঁর অন্য নারী সহকর্মীদের গালিগালাজ করেন। হলের ২৫ জন আবাসিক শিক্ষক ওই লাঞ্ছনার প্রতিকার চেয়ে তাঁর কাছে চিঠি দিয়েছেন। প্রতিকার না পেলে তাঁরা একযোগে পদত্যাগ করবেন বলেও জানিয়েছেন। তিনি নুরুলদের বিরুদ্ধে ব্যালট ছিনতাইয়েরও অভিযোগ আনেন।

যদিও এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় ব্যালট ছিনতাইয়ের কোনো অভিযোগ উল্লেখ করা হয়নি। মামলার বাদী মারজুকা রায়না বলেন, তাঁরা (নুরুলসহ অন্যরা) হলের প্রাধ্যক্ষ ও অন্য শিক্ষকদের উদ্দেশ করে প্রচুর বাজে কথা বলছিলেন। বিষয়টি তাঁর আত্মসম্মানে আঘাত দিয়েছে বলে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি করেছেন।

তবে নুরুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘এটা একটা মিথ্যা মামলা। এটা ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক আছেন, যাঁরা দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কারণে জনপ্রিয় শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন।’

নুরুল হকসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদ ও রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল রাতে বিক্ষোভ করেছেন হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, ‘ছাত্রলীগের ইন্ধনেই’ ওই মামলা করা হয়েছে।

বিক্ষোভের বিষয়ে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী ও রোকেয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক জিনাত হুদাকে ফোন করা হলেও তাঁরা ধরেননি৷ স্বাধীনতার পরে যতবার ডাকসু নির্বাচন হয়েছে, তার সব কটিতেই বিজয়ী হয়েছেন সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রার্থীরা। কিন্তু এবার প্রথাগত বিরোধীদলীয় ছাত্রসংগঠনগুলো জয়ী হওয়া তো দূরের কথা, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। সেখানে চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আলোচিত ছাত্রনেতা মো. নুরুল হক সহ সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

শুধু তা-ই নয়, ডাকসুর জিএস-এজিএসসহ বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ পদেই প্রথাগত ছাত্রসংগঠনগুলোর বাইরে গিয়ে এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রার্থীরা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছেন। একটি সম্পাদকীয় পদে জিতেছেনও। আবার ১৮টি হল সংসদ নির্বাচনে ১২টিতে ভিপি পদে ছাত্রলীগ জয়ী হলেও বাকি ছয়টি হলে ভিপি পদে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এখানেও ছাত্রলীগের বাইরে প্রথাগত ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রার্থীরা পিছিয়ে রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা ও শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন হলো, এর মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে নতুন প্রবণতা শুরু হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সত্যিকারভাবে কাজ করলে যে শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাওয়া যায়, তার প্রমাণ রেখেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। আবার এটাও ঠিক যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের বাইরে অন্যান্য বিরোধী মতের ছাত্রসংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে কার্যক্রম চালাতে পারেনি। সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা।

ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের এই নির্বাচনে জেতা বা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে একটা নতুন ধারা শুরু হলো। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে একধরনের জিম্মি ছিল ক্যাম্পাস। এখনো আছে। অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীরা হলে থাকতেও পারেননি। ফলে সেই শূন্যতা পূরণ করেছেন কোটা আন্দোলনকারীরা। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনকে যারা পছন্দ করে না, তাদের সমর্থন নিয়েই মূলত এই প্ল্যাটফর্ম হয়েছে এবং এত কিছুর পরও তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এই নির্বাচনে ছাত্রদল কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি। ছাত্রদলের প্রার্থীদের মধ্যে সম্পাদকীয় একটি পদ ছাড়া কেউ হাজারের ওপরে ভোট পাননি।

জিএস-এজিএসসহ ডাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে ছাত্রলীগ ২৩টিতে জয়ী হলেও সব ছাপিয়ে ভিপি পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হকের বিজয়ী হওয়ার বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ছাত্রলীগ এই পদে পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে ফল ঘোষণার পর থেকেই বিক্ষোভ করেছে। মঙ্গলবারও তারা উপাচার্যের বাড়ির সামনে প্রায় দিনভর বিক্ষোভ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক ও তাঁর সহকর্মীদের ধাওয়াও করেছে ছাত্রলীগ। অবশ্য ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী বিকেলে টিএসসিতে গিয়ে নুরুল হকের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। এতে ক্যাম্পাসে উত্তেজনার পারদ কমলেও ছাত্রলীগের ভেতরে এ নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে নুরুল হকের প্রতি শিক্ষার্থীদের সহানুভূতি কাজ করেছে। তবে তাঁরা মনে করছেন, ভেতর থেকে ছাত্রলীগের একটি অংশ সংগঠনের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরীকে ভোট দেয়নি। ভিপি পদে রেজওয়ানুল পেয়েছেন ৯ হাজার ১২৯ ভোট, আর নুরুল হক ১১ হাজার ৬২ ভোট পেয়েছেন। তাঁরা বলছেন, জিএস পদে বিজয়ী ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ও এজিএস পদে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন যত ভোট পেয়েছেন, দলের সভাপতি তার চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন।

ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিএস পদে জিতেছেন ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানী (ভোট ১০,৪৮৪)। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান (ভোট ৬,০৬৩)। এই পদে স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদের প্রার্থী এ আর এম আসিফুর রহমান তৃতীয় হয়েছেন। তিনি ভোট পেয়েছেন ৪,৬২৮টি। রাশেদ ও আসিফের ভোট ভাগাভাগি হওয়ায় ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানীর জয়টি সহজ হয়েছে বলে ক্যাম্পাসে আলোচনা আছে।

এজিএস পদে জিতেছেন ছাত্রলীগের সাদ্দাম হোসেন। তিনি সহজে জয়ী হবেন বলে আগে থেকেই ক্যাম্পাসে আলোচনা ছিল। তিনি সবচেয়ে বেশি ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পেয়েছেন। এই পদেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন।

সমাজসেবা সম্পাদক পদে জিতেছেন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী আখতার হোসেন। এ ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক এবং আন্তর্জাতিক সম্পাদকসহ বেশির ভাগ পদেও জয়ী ছাত্রলীগের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী।

ভিপি পদে কয়েকটি বাম সংগঠনের মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের আলোচিত প্রার্থী লিটন নন্দী পেয়েছেন ১ হাজার ২১৬ ভোট। স্বতন্ত্র জোটের ভিপি প্রার্থী অরণি সেমন্তি খান পেয়েছেন ২ হাজার ৬৭৬ ভোট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বলেন, এখানে শিক্ষার্থীরা যাঁদের ভোট দিয়েছেন, তাঁরাই জিতেছেন। নির্বাচন নিয়ে যৎসামান্য উত্তেজনা থাকলেও দুই ভিপি প্রার্থী শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।

রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের জেরে ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ছাত্রদল ডাকসুর ২৫টি পদের একটিতেও জয় পায়নি। ১২টি সম্পাদকীয় পদের মাত্র একটিতে ছাত্রদলের প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পেরেছেন। কমন রুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে ছাত্রদলের কানেতা ইয়া লাম-লাম দ্বিতীয় হয়েছেন।

ভিপি পদে এই সংগঠনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান মাত্র ২৪৫ ভোট পেয়ে পঞ্চম হয়েছেন। এই সংগঠনের জিএস প্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার ৪৬২ ভোট পেয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন।

১৮টি হল সংসদের কোনো পদেও ছাত্রদল জয় পায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও ছিল না। হল সংসদগুলোতে ২৩৪টি পদের বিপরীতে ছাত্রদলের প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৫৪ জন।

ছাত্রদলের একাধিক নেতা ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ছাত্রদল সক্রিয় ছিল না। আবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় সবাই অছাত্র ও বয়স্ক। এসব কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী বলেন, ছাত্রদল ১০ বছর ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি। কী কারণে যেতে পারেনি, তা জাতি ও ছাত্রসমাজ জানে। এর সুযোগ নিয়ে ছাত্রলীগ কারচুপি ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। ছাত্রদলের চেয়ে ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশি ভালো ফল করেছেন। এ বিষয়ে শহীদ উদ্দীন বলেন, ছাত্রদল ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বলেই সাধারণ ছাত্ররা সে জায়গাটা নিয়েছেন।

কেন কোটা আন্দোলনকারীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়?

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোটা সংস্কারের দাবিটি ছিল শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। যে কারণে এতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিপুল সমর্থন ছিল। ক্ষমতাসীনদের কঠোর অবস্থান, হামলা-মামলার মুখে শেষ পর্যন্ত দাবি আদায়ে সফল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের আস্থায় ছিল এই পরিষদ। আবার হলগুলোতেও ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের বিপক্ষে ভেতরে ভেতরে একটি অবস্থান ছিল।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গত ১০ বছরে হলগুলোতে ছাত্রলীগের বাইরে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো তৎপরতা চালাতে পারেনি, সম্ভবও ছিল না। অন্যদিকে চাকরিতে কোটা সংস্কারের মতো জীবিকা-সম্পর্কিত অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে জনপ্রিয় হয়েছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। কাজেই তাঁরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন পেয়েছেন। তাঁর মতে, আগে রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে যাঁরা আন্দোলন করেছেন, তাঁরাই ডাকসুতে জয়ী হয়েছেন। এখন জীবিকার অধিকার নিয়ে আন্দোলন করা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা জয় পেয়েছেন।

ডাকসুর নতুন ভিপি নুরুল হক – কোটা আন্দোলন থেকে যেভাবে ছাত্র সংসদের শীর্ষ নেতা

বাংলাদেশে দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভিপি হিসেবে বিজয়ী হওয়ার পর নুরুল হক নুর এখন রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শিক্ষাঙ্গনে আলোচনার শিরোনাম। সাধারণ একজন শিক্ষার্থী থেকে ডাকসুর ভিপি হওয়ার -এই ঘটনাকে ‘চমক’ হিসেবে দেখছেন অনেকেই। ভোটের ফলাফল ঘোষণার সময় ভিপি পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হককে সহ-সভাপতি পদে বিজয়ী ঘোষণা করা হলে, ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রথমে মেনে নিতে অস্বীকার এবং বিক্ষোভ করে। পরে অবশ্য ভিপি হিসেবে নুরুল হককে স্বাগত জানায় তারা।

ছাত্রলীগ, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে সাধারণ ছাত্রের ব্যানারে কতটা সাফল্য পাবেন সে নিয়ে অনেকের শঙ্কার মাঝেই নির্বাচনে প্রার্থী হন কোটা আন্দোলনের এই নেতা। পরে তিনিই প্রায় দুই হাজার ভোটের ব্যবধানে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে পরাজিত করেন। তার মোট প্রাপ্ত ভোট ১১ হাজার ৬২টি।

নুরুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়নরত। কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক তিনি। বিতর্ক, অভিনয়সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বেশ কয়েকবার হামলার মুখে পড়েন তিনি। নুরুল হকের জন্ম পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার চর বিশ্বাস ইউনিয়নে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে পরিবারের তৃতীয় সন্তান নূর। তিনি তার মাকে হারান ১৯৯৩ সালে।

সাধারণ একটি পরিবারে জন্ম নেয়া নূরের বাবা সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোঃ ইদ্রিস হাওলাদার। তিনি জানান, “নূর মাতৃহারা হয়েছেন ১৯৯৩ সালে যখন তার বয়স আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয়বছর।”

“আমাদের যোগাযোগ সমস্যার কারণে তার মায়ের চিকিৎসা করাতে না পারার কারণে হয়তো সে ডাক্তার হতে চেয়েছিল।” চর এলাকাতেই সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি।

এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈরে চাচাতো বোনের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন এবং কালিয়াকৈর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। এইচএসসি পাশ করেন উত্তরা হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। মেডিকেল কলেজে সুযোগ না পেয়ে প্রথমে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

নুরুল হক কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্বের কারণে গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পর থেকেই একদিকে শারীরিক নানারকম হামলার শিকার যেমন হয়েছেন, তেমনি সাইবার জগতেও শিকার হয়েছেন আক্রমণের।

তিনি ‘শিবির-কর্মী’ বলে অনলাইনে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়। এমনকি নির্বাচনের ফল ঘোষণার রাতে নূর-এর বিজয়ের খবরে ‘শিবিরের ভিপি মানি না’ এমন স্লোগানও দিয়েছিল ছাত্রলীগ।

তবে নুরুল হক কখনো শিবিরের রাজনীতিতে যুক্ত ছিল কি-না জানতে চাইলে তার পরিবার তা নাকচ করে দিয়েছেন। তবে নুরুল হক এর আগে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় হল কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন। হাজী মুহম্মদ মহসিন হল ইউনিটের মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক উপ-সম্পাদক ছিলেন বলে জানা গেছে।

নূর যেভাবে আজ পুরো দেশের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন সে প্রসঙ্গে তার বাবা হাওলাদার বলেন, “রাজনীতি দুশ্চিন্তার বিষয়। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, নানা ধরনের ঝামেলা থাকে, জেল জুলুম হয়, অন্যায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়, এগুলো যন্ত্রণার ব্যাপার আছে।”

“কিন্তু আমার ছেলে সব সাধারণ ছাত্রছাত্রীর জন্য আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে এর শিকারও হয়েছে তবু আমি চাই সে এটা চালিয়ে যাক।”

নূর-এর বাবা চান তার ছেলে যে ধারায় রাজনীতির মধ্যে এস পড়েছে সে ধারা ধরে রাখুক সততার সাথে। “আমার ছেলে নষ্ট হয়ে যাক এটা আমি কখনোই চাইনা। আমি চাই আমার ছেলের দ্বারা দেশের মঙ্গল হোক।” সাধারণ পরিবার থেকে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হলেও একেকটি আন্দোলন তাকে গড়ে তুলেছে বলে তার বাবা মনে করছেন।

হাওলাদার বলছেন, “অনেকেই বলছে সে সাধারণ পরিবারের-এটা ঠিক, তবে সে যে আন্দোলন করেছে সেটা সকল মানুষের আন্দোলন ছিল, সারা বাংলার মানুষের সমর্থন পেয়েছে সে।”

“সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে জনজীবনের নিরাপত্তার জন্য তারা আন্দোলন করেছে। সে প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, এইভাবে সে নিজেকে তৈরি করেছে।”

“সুতরাং সে হঠাৎ করে এ জায়গায় আসেনি,” বলছেন নুরুল হকের বাবা। তিনি জানান, “একবার ডিবি পুলিশ তাকে ধরেছিল এবং পরে ছেড়ে দিয়েছিল। তবে আমাদের কোন ভয়ভীতি নেই।”

“আমার ছেলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেভাবে জড়িত না। কোনও রাজনীতির ব্যানারে নির্বাচন করেনি।”তিনি বলেন, “সে [নুরুল] এখন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী, তাকে জ্ঞান দেয়ার কিছু নাই, সে যা ভালো মনে করবে তাই করবে।”

একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন বাবুল মুন্সী জানান, “নূরকে এখানকার মানুষ খুব একটা চিনতো না। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় এলাকার মানুষ তার কথা জানতে পারে।”

“এখন তার এই অর্জনে চরাঞ্চলের মানুষকে আনন্দিত করেছে,” -এমনটাই জানালেন তিনি।