আমার যশোর বলে কথা : প্রসঙ্গ : যশোর বইমেলা -সৈয়দ আহসান কবীর

70

আমার জন্মস্থান যশোরের বুকে বইমেলা হচ্ছে শুনে খুব আনন্দে গিয়েছিলাম ঘুরতে। শব্দের বিশুদ্ধ চর্চায় যারা মেতে আছেন তাদের কয়েকজনও সাথে ছিলেন।

টাউন হল ময়দান নামে বেশি পরিচিত ‘মুনশী মেহের উল্লাহ ময়দান’-এ মেলা হচ্ছে। ঢুকতেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। যশোর ইনস্টিটিউটের সদর দরজায় জমকালো বিজ্ঞাপন ব্যানারে বড় বড় করে লেখা রয়েছে- ‘এসএমই পণ্যমেলা।’ ভুল করে ভুল শুনে ‘বইমেলা’ ভেবে চলে এলাম ভেবে কিছুটা লজ্জায় পড়লাম। লিখিয়ে বন্ধুদের বললাম- নারে ভাই, ভুল শুনেছিলাম বোধ হয়, চলেন চা-টা গিলে চলে যাই।
সাথের একজন বললেন, এলেনই যখন, ঘুরে দেখে আসুন না।

গেলাম। বাহ! এসএমই পণ্যমেলার দরজা মাইকেল, শরৎ, রবী, নজরুলদের ছবি বই আকারে তৈরি করে সাজানো। বেশ লাগলো। ‘এসএমই পণ্যমেলাতেও কবি-সাহিত্যিকদের কদর করা হয় বৈকি। এ যে আমার যশোর। যশোর ছাড়া আর কোথায় এমন কদর হতে পারে?’– ভাবতে ভাবতে বুক ফুলে উঠলো। যশোর জেলা প্রশাসনকে এমন একটি মেলা করার জন্য কয়েকশবার ধন্যবাদ দিয়ে দিলাম এরই মধ্যে। আমার যশোর বলে কথা, আর না হলে কে পারে? কেইবা পেরে দেখিয়েছে এমন?

বুকটান করে প্রবেশ করলাম মেলায়। ঢুকতেই শতাব্দীর বটমূল-মঞ্চে টানানো ব্যানারে ফুলস্ক্রিন জুড়ে এসএমই পণ্যমেলা। অথচ মাইকে ঘোষণা হচ্ছে- এবার স্বরচিত কবিতা নিয়ে আসছেন ওমুক। ওমুক যা পড়লেন তা কবিতা হয়ে ওঠেনি। তবে আয়োজনটি রাখার জন্য আয়োজক কমিটিকে আবারও ধন্যবাদ জানালাম। ‘লেখাকে এভাবে মূল্যায়ন আমার যশোর বলেই সম্ভব! আমার যশোর বলে কথা।

আমার উল্লাস আর আনন্দ যতো বাড়ছিলো, সাথের বন্ধুদের চোখমুখে ততোই আবছায়া নেমে আসছিলো। কিন্তু ক্যানো বুঝতে পারছিলাম না। অবশ্য বোঝার প্রয়োজনও মনে করছিলাম না। ‘পণ্যমেলা’তে এমন সব আয়োজন থাকলে তো ভুল এট্টু হতেই পারে- বোঝার ভুল, উৎসাহ দিতে ভুল। ওটা কিছু না।

মেলার ডান দিক থেকে এবার চোখ বুলিয়ে নিতে চেষ্টা করলাম। এসএমই পণ্যমেলায় ডানপাশের সারিবদ্ধ স্টলগুলোতে বেশ মানুষের ভিড়। সোজাসুজি স্টলগুলো খালি, পণ্যও নেই, নেই বিক্রেতা। বামপাশের স্টলগুলোতে বইয়ের মতো কিছু মনে হতে লাগলো। দৃষ্টি উপরে তুলতেই চোখে পড়লো স্টলের নামের সাথে লেখা আছে ‘বইমেলা’। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। আর ভাবছিলাম। কী ভাবছিলাম তা বলবো কীভাবে?

একটি মেয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। আমার পরিচিত। বেশ পড়ুয়া। বললাম, ওদিকে কোথায় যাও? বললো- দাদা, বই কিনতে এসেছিলাম। যা-তা অবস্থা। একটা চাদর কিনে বিদেয় হবো।
আমি বন্ধুদের দিকে ফিরলাম। তাদের ঠোঁট-মুখ-চোখ এবার হাসতে শুরু করলো। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, সে হাসি বিদ্রুপের হাসি, সে হাসি তাচ্ছিলের হাসি। সে হাসি- বইকে পণ্য বানিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভের অগ্নি!

ঠিক এমন সময় শতাব্দীর বটমূল মঞ্চে কয়েকজন বানরের মতো লাফিয়ে রক সংগীত পরিবেশন শুরু করলো। জানলাম- এমনইভাবে প্রতিদিন সহ্য করতে হচ্ছে সৃজনশীল কবি সাহিত্যিকদের। তাই তারা মেলাতে ভিড়ছেন না। আর যারা আসছেন তারা হয় লজ্জায়, না হয় বইকে পণ্য করতে।